শহরের অভিশাপ

 

শিরোনাম: শহরের অভিশাপ 

গ্রামের নাম ছিল শিউলিতলা। মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না, কিন্তু যারা একবার গেছে, তারা জানে—এই গ্রাম ভুলে থাকা যায় না। চারদিকে শিউলি গাছ, সন্ধ্যা নামলেই হালকা কুয়াশা, আর গ্রামের শেষ মাথায় একটা পরিত্যক্ত রেললাইন। লোকেরা বলে, ওই লাইনে মাঝরাতে একটা ট্রেন আসে—যার কোনো সময়সূচি নেই, কোনো টিকিট নেই, আর কোনো যাত্রী জীবিত নয়।


১. ফিরে আসা

আমি বহু বছর পর গ্রামে ফিরলাম। শহরের চাকরি, ব্যস্ত জীবন—সব ছেড়ে হঠাৎ কেন ফিরলাম, সেটা আমিও ঠিক জানতাম না। হয়তো বাবার মৃত্যুর পর শিকড়ের টানটা টের পেয়েছিলাম।

রাতে বাড়িতে ঢুকেই ঠাকুমা বললেন,

“সূর্য ডোবার পর রেললাইনের দিকে যাস না।”

আমি হেসে উড়িয়ে দিলাম। ভুত-প্রেতের গল্পে আমি কখনো বিশ্বাস করিনি।

কিন্তু সেই রাতেই, ঠিক বারোটা এক মিনিটে, দূর থেকে ভেসে এলো একটা শব্দ— ট্রেনের হুইসেল।

সমস্যা একটাই—এই লাইনে পঁয়ত্রিশ বছর ধরে কোনো ট্রেন চলে না।


২. পুরনো কাহিনি

পরদিন সকালে গ্রামের চায়ের দোকানে বসলাম। সবাই চুপচাপ। ট্রেনের কথা তুলতেই দোকানদার গলা নামিয়ে বলল,

“ওটা শেষ ট্রেন। ১৯৯০ সালের দুর্ঘটনার ট্রেন।”

সেই বছর পূর্ণিমার রাতে একটা যাত্রীবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে আগুনে পুড়ে যায়। সরকারি হিসেবে সবাই মারা গিয়েছিল। কিন্তু গ্রামবাসীদের বিশ্বাস—সবাই নয়।

“যারা মরেনি, তারা আটকে গেছে,” দোকানদার ফিসফিস করে বলল।

আটকে গেছে—এই লাইনের মধ্যে।


৩. পূর্ণিমার রাত

পূর্ণিমার রাতে আমি আর থাকতে পারলাম না। কৌতূহল আমাকে টেনে নিল রেললাইনের দিকে। চারপাশে কুয়াশা, শিউলির গন্ধ, আর অদ্ভুত ঠান্ডা।

হঠাৎ লাইন কেঁপে উঠল।

দূর থেকে আলো আসছে।

ট্রেন আসছে।

কিন্তু সে ট্রেনের চাকা মাটিতে লাগছে না। ভাসছে। জানালার ভেতর ছায়া—মানুষের মতো, কিন্তু চোখ নেই।

একজন দরজায় দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকাল। তার মুখটা আমার বাবার মতো।

“ফিরে আয়নি কেন এতদিন?”

আমার গলা শুকিয়ে গেল।


৪. শেষ স্টেশন

ট্রেন থামল। দরজা খুলে গেল। ভেতর থেকে ডাক—

“একটা সিট খালি আছে।”

আমি এক পা এগোলাম। তখনই মনে পড়ল ঠাকুমার কথা। পেছন ফিরে তাকালাম—গ্রাম নেই, বাড়ি নেই। শুধু রেললাইন আর অন্ধকার।

আমি বুঝলাম—একবার উঠলে আর নামা যাবে না।

জোরে চিৎকার করলাম। চোখ বন্ধ করলাম।


৫. সকাল

চোখ খুলে দেখি, আমি রেললাইনের পাশে পড়ে আছি। সূর্য উঠছে। ট্রেন নেই।

কিন্তু আমার হাতে একটা পুরনো কাগজ।

ট্রেনের টিকিট।

তারিখ: আজকের।

গন্তব্য: শেষ স্টেশন।

সেই দিন থেকে আমি জানি—ট্রেনটা এখনো আমাকে ডাকছে।

আর কোনো এক পূর্ণিমার রাতে…

আমি আর ফিরব না।


সমাপ্ত

Post a Comment

Previous Post Next Post