অভিশপ্ত নিশিডাক: নিস্তব্ধপুরের সেই অন্ধকার রহস্য

 


অভিশপ্ত নিশিডাক: নিস্তব্ধপুরের সেই অন্ধকার রহস্য

গ্রামের নাম নিস্তব্ধপুর। নামটা শুনলেই কেমন যেন গা ছমছম করে। এই গ্রামের শেষ মাথায় অবস্থিত এক বিশাল পুরোনো অট্টালিকা, যা 'চৌধুরী ভিলা' নামে পরিচিত। প্রায় একশ বছর ধরে বাড়িটা পরিত্যক্ত। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস, এই বাড়িতে যারা একবার পা রেখেছে, তারা হয় পাগল হয়ে গেছে, নয়তো চিরতরে হারিয়ে গেছে।

আকাশ পেশায় একজন প্যারানরমাল ইনভেস্টিগেটর। সে তার দামি ক্যামেরা, ভয়েস রেকর্ডার আর সেন্সর নিয়ে নিস্তব্ধপুরে পৌঁছাল। তার উদ্দেশ্য একটাই—মানুষের মনের ভয় দূর করা এবং প্রমাণ করা যে ভূত বলে কিছু নেই। কিন্তু সে জানত না, এই জেদই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হতে যাচ্ছে।

রহস্যময় প্রবেশ

রাত তখন ১১টা। অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার চারদিকে। আকাশের হাতে একটি শক্তিশালী লেজার টর্চ। সে যখন বিশাল লোহার গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল, একটা কর্কশ শব্দ পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ল। বাগানের গাছগুলো যেন কঙ্কালের মতো হাত বাড়িয়ে তাকে স্বাগত জানাচ্ছে।

বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই এক অদ্ভুত শীতলতা আকাশকে গ্রাস করল। থার্মোমিটারে দেখা গেল তাপমাত্রা হঠাৎ করে ১৮°C থেকে ৪°C-এ নেমে এসেছে। আকাশ বিড়বিড় করে বলল, "এটা কোনো প্রাকৃতিক কারণ হতে পারে।" কিন্তু তখনই তার ইভিপি (EVP) রেকর্ডারে একটা অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর শোনা গেল—"চলে যা... ফিরে যা..."

দোতলার সেই বন্ধ ঘর

আকাশ যখন দোতলায় উঠল, তার পায়ের শব্দে কাঠের মেঝে মটমট করে উঠছিল। হঠাৎ করিডোরের শেষ মাথায় একটা ছায়াকে দ্রুত সরে যেতে দেখল সে। সে দৌড়ে সেখানে গেল, কিন্তু কাউকেই পেল না। বদলে সে দেখল দেয়ালে ঝোলানো চৌধুরী বংশের পুরোনো তৈলচিত্রগুলো। অবাক করার বিষয় হলো, প্রতিটা ছবির চোখের মণি যেন আকাশের গতিবিধির সাথে নড়াচড়া করছে!

হঠাৎ তার নজরে এল একটি ঘর, যেটির দরজায় বড় বড় শিকল দিয়ে তালা দেওয়া। কৌতূহলী আকাশ হাতুড়ি দিয়ে তালাটা ভেঙে ফেলল। ভেতরে ঢুকতেই এক তীব্র পচা লাশের গন্ধে তার বমি আসার উপক্রম হলো। ঘরের মাঝখানে একটি বড় রাজকীয় আয়না, যার ওপরটা কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা।

ভয়ঙ্কর সেই মুহূর্ত

আকাশ যখন কাপড়টা সরালো, সে যা দেখল তার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। আয়নায় তার নিজের প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে না। বদলে আয়নার ভেতরে সে দেখতে পাচ্ছে নিজেরই এক বীভৎস রূপ—যার চোখগুলো উপড়ে ফেলা হয়েছে এবং মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে।

হঠাৎ ঘরের কোণ থেকে এক অমানুষিক খিলখিল হাসি শোনা গেল। আকাশ টর্চ ঘোরাতেই দেখল, ছাদের কার্নিশে ঝুলে আছে এক নারী মূর্তি। তার গায়ের চামড়া ঝুলছে, আর নখগুলো অস্বাভাবিক লম্বা। সে নিচু গলায় ডাকল, "আকাশ... এসেছিস?"

আকাশের শিরদাঁড়া দিয়ে হিমেল স্রোত বয়ে গেল। সে যখন পালানোর জন্য দরজার দিকে দৌড় দিল, দেখল দরজাটা দেয়ালের সাথে মিশে গেছে। কোনো বের হওয়ার পথ নেই! দেয়ালগুলো থেকে রক্ত চুইয়ে পড়তে শুরু করল। চারপাশ থেকে শত শত অস্পষ্ট ছায়া তাকে ঘিরে ধরল। তারা সবাই বিড়বিড় করে বলছে, "আমাদের সাথে থাক... আমাদের সাথে মিশে যা..."

শেষ পরিণতি

পরদিন সকালে গ্রামবাসীরা চৌধুরী ভিলার সামনে আকাশের ক্যামেরাটা খুঁজে পায়। লেন্সটা চূর্ণ-বিচূর্ণ। কিন্তু মেমোরি কার্ডে শেষ কয়েক সেকেন্ডের যে ফুটেজ ছিল, তা দেখে পুলিশেরও রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। ভিডিওতে দেখা যায়, আকাশ শূন্যে ঝুলে আছে এবং অদৃশ্য কেউ তার শরীরটাকে দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে।

আজও যদি কেউ নিস্তব্ধপুরের সেই বাড়ির পাশ দিয়ে যায়, তবে গভীর রাতে আকাশের আর্তনাদ আর ক্যামেরা ফ্ল্যাশের মতো এক অদ্ভুত আলো দেখতে পায়। সে হয়তো আজও সেখানে তার হারানো অস্তিত্ব খুঁজে বেড়াচ্ছে।

Post a Comment

Previous Post Next Post